রাতে না ঘুমিয়ে দিনে ঘুমালে কি ক্ষতি হয়
থাইরয়েড কমানোর ঘরোয়া উপায় | থাইরয়েড নরমাল কত
রাতে না ঘুমিয়ে দিনে ঘুমালে কি ক্ষতি হয় এই প্রশ্নটি অনেকের মনেই থাকে বিশেষ
করে যারা রাত জেগে কাজ করেন তাদের মধ্যে দিনে ঘুমানোর অভ্যাস প্রায়ই দেখা যায়।
তাই আজকের এই আর্টিকেলে আপনারা বিস্তারিত জানতে পারবেন রাতে না ঘুমিয়ে দিনে
ঘুমালে শরীরে ঠিক কী কী ক্ষতি হয়, কোন কোন রোগের ঝুঁকি বাড়ে এবং এই ক্ষতিকর
অভ্যাস থেকে কীভাবে বের হওয়া যায়।
পেজ সূচিপত্রঃ রাতে না ঘুমিয়ে দিনে ঘুমালে কি ক্ষতি হয়
- রাতে না ঘুমিয়ে দিনে ঘুমালে কি ক্ষতি হয়
- সার্কাডিয়ান রিদম কী এবং এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
- দিনে ঘুমালে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কতটা বাড়ে
- রাতে না ঘুমালে মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যে কী প্রভাব পড়ে
- দিনে ঘুমানোর কারণে হজম ও পেটের সমস্যা কীভাবে তৈরি হয়
- রাত জেগে থাকলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় কেন
- দিনে ঘুমানোর কারণে ওজন বৃদ্ধি হওয়ার পেছনের কারণ কী
- রাত্রিকালীন শিফটে কাজ করলে কীভাবে স্বাস্থ্য রক্ষা করবেন
- রাতের ঘুমের অভ্যাস ফিরিয়ে আনার কার্যকর উপায়
- লেখকের শেষ কথা
রাতে না ঘুমিয়ে দিনে ঘুমালে কি ক্ষতি হয়
রাতে না ঘুমিয়ে দিনে ঘুমালে কি ক্ষতি হয় এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে
প্রথমে বুঝতে হবে রাতের ঘুম এবং দিনের ঘুমের মধ্যে পার্থক্য কোথায়। রাতের
ঘুমে শরীরে মেলাটোনিন হরমোন নিঃসৃত হয় যা অন্ধকারের সংকেত পেয়ে পিনিয়াল
গ্রন্থি থেকে বের হয় এবং ঘুমের গভীরতা ও মান নিশ্চিত করে। এই হরমোনটি শুধু
ঘুম আনে না বরং এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হিসেবেও কাজ করে যা
শরীরের কোষগুলোকে রাতের বেলায় মেরামত ও পুনরুজ্জীবিত করে। দিনের আলোতে
ঘুমালে মেলাটোনিন পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হয় না ফলে ঘুম গভীর হয় না এবং শরীর
পুরোপুরি বিশ্রাম পায় না।
রাতের ঘুমের সময় শরীরে গ্রোথ হরমোনও সবচেয়ে বেশি নিঃসৃত হয় বিশেষত ঘুমের
প্রথম তিন থেকে চার ঘণ্টায়। এই গ্রোথ হরমোন শুধু শিশুদের বৃদ্ধির জন্য নয়,
বড়দের ক্ষেত্রেও এটি মাংসপেশির মেরামত, হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখা, চর্বি
বিপাক এবং ত্বকের পুনর্গঠনে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। যারা রাতে না ঘুমিয়ে
দিনে ঘুমান তারা এই গ্রোথ হরমোনের পর্যাপ্ত সুবিধা পান না কারণ দিনের আলোতে
ঘুমের সময়ও এই হরমোনের নিঃসরণ রাতের তুলনায় অনেক কম হয়।
শুধু হরমোনের বিষয়ই নয়, রাতের ঘুমে মস্তিষ্কের একটি বিশেষ পরিষ্কার
প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় যাকে গ্লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম বলা হয়। এই প্রক্রিয়ায়
মস্তিষ্ক থেকে দিনের বেলায় জমা হওয়া বিষাক্ত প্রোটিন বিশেষত
বেটা-অ্যামিলয়েড বের করে দেওয়া হয় যা আলঝেইমার রোগের সাথে সরাসরি
সম্পর্কিত। যারা নিয়মিত রাতে না ঘুমিয়ে দিনে ঘুমান তাদের মস্তিষ্কে এই
বিষাক্ত প্রোটিন জমতে থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি মারাত্মক স্নায়বিক রোগের
কারণ হতে পারে।
সার্কাডিয়ান রিদম কী এবং এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
সার্কাডিয়ান রিদম হলো শরীরের একটি প্রাকৃতিক ২৪ ঘণ্টার জৈবিক চক্র যা শরীরের
প্রতিটি কোষ, অঙ্গ এবং সিস্টেমের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। এই রিদম মূলত
সূর্যের আলোর উপর নির্ভর করে কাজ করে এবং আমাদের চোখের রেটিনায় থাকা বিশেষ
কোষগুলো আলোর পরিবর্তন বুঝে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে সংকেত পাঠায়। এই
সংকেতের উপর ভিত্তি করে শরীর ঘুম ও জাগ্রত থাকার সময় নির্ধারণ করে, হরমোন
নিঃসরণের সময়সূচি ঠিক করে এবং শরীরের তাপমাত্রা ও রক্তচাপের ওঠানামা
নিয়ন্ত্রণ করে।
সার্কাডিয়ান রিদম শুধু ঘুমের বিষয়ে নয়, এটি শরীরের হজম শক্তি, রোগ
প্রতিরোধ ক্ষমতা, হরমোনের ভারসাম্য, মানসিক কার্যক্ষমতা এবং এমনকি কোষ
বিভাজনের সময়সূচিও নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে মানবদেহের প্রায় ৮০
ভাগ জিন সার্কাডিয়ান রিদম মেনে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে যার মানে
শরীরের বেশিরভাগ কাজই একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে চলে।
যখন কেউ রাত জেগে দিনে ঘুমানোর অভ্যাস তৈরি করেন তখন এই সার্কাডিয়ান রিদম
বিঘ্নিত হয় এবং শরীরের প্রতিটি সিস্টেম একটি বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে পড়ে
যায়। বিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকে "সোশ্যাল জেটল্যাগ" বলে থাকেন যা ঠিক বিমানে
লম্বা যাত্রার পর যে জেটল্যাগ হয় তার মতোই কিন্তু প্রতিদিন প্রতিদিন।
দীর্ঘদিন এভাবে চললে শরীর একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পড়ে যায় যা থেকে বের
হওয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।
দিনে ঘুমালে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কতটা বাড়ে
রাতে না ঘুমিয়ে দিনে ঘুমালে কি ক্ষতি হয় এই প্রশ্নের সবচেয়ে উদ্বেগজনক
উত্তরগুলোর একটি হলো হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি। ইউরোপিয়ান হার্ট
জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যারা নিয়মিত রাত জেগে দিনে ঘুমান
তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। এর
কারণ হলো রাতের ঘুমের সময় রক্তচাপ এবং হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকভাবে কমে আসে যা
হৃদয়কে বিশ্রাম দেয়, কিন্তু দিনে ঘুমালে শরীর সম্পূর্ণরূপে এই বিশ্রামের
সুযোগ পায় না এবং হৃদয় সবসময় চাপের মধ্যে থাকে।
আরো পড়ুনঃ তুলসী পাতা খাওয়ার উপকারিতা ও সঠিক নিয়ম
ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রেও দিনে ঘুমানো বা রাত জাগার প্রভাব অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। রাত জাগলে শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায় এবং এই
হরমোন ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় যা রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণকে কঠিন
করে তোলে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যারা নিয়মিত রাত জেগে কাজ করেন তাদের
টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি এবং
এই ঝুঁকি বছরের পর বছর রাত জাগার অভ্যাস চলতে থাকলে আরও বাড়তে থাকে।
এছাড়াও রাতে না ঘুমিয়ে দিনে ঘুমানোর ফলে শরীরে প্রদাহের মাত্রা বেড়ে যায়
যা হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের একটি প্রধান কারণ।
রক্তে C-reactive protein এর মাত্রা বাড়ে যা হৃদরোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ
ঝুঁকি নির্দেশক। তাই যারা পরিবারে হৃদরোগ বা ডায়াবেটিসের ইতিহাস আছে তাদের
জন্য রাত জেগে দিনে ঘুমানোর অভ্যাস বিশেষভাবে বিপজ্জনক। এই জন্য রাতে না
ঘুমিয়ে দিনে ঘুমালে কি ক্ষতি হয় এটি আমাদের জানা প্রয়োজন।
রাতে না ঘুমালে মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যে কী প্রভাব পড়ে
মস্তিষ্কের উপর রাতে না ঘুমানোর প্রভাব এতটাই গভীর যে অনেক গবেষক একে "ধীর
গতির বিষক্রিয়া" বলে থাকেন। রাতের গভীর ঘুমে মস্তিষ্কের নিউরনগুলো নিজেদের
মধ্যে যোগাযোগ পুনরুদ্ধার করে, নতুন স্মৃতি দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে পরিণত হয়
এবং শেখার ক্ষমতা শক্তিশালী হয়। যারা নিয়মিত রাতে না ঘুমান তাদের মস্তিষ্কে
হিপ্পোক্যাম্পাসের কার্যক্ষমতা কমে যায় যা স্মৃতিশক্তি ও শেখার জন্য দায়ী
অঞ্চল। এই কারণে রাত জাগার অভ্যাসে থাকা মানুষেরা প্রায়ই মনে করেন তারা কিছু
মনে রাখতে পারছেন না বা মনোযোগ ধরে রাখতে পারছেন না।
মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকেও দিনে ঘুমানো এবং রাতে জেগে থাকার পরিণতি
অত্যন্ত গুরুতর। গবেষণায় দেখা গেছে যারা নিয়মিত রাত জাগেন এবং দিনে ঘুমান
তাদের মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগ রোগের হার রাতে ঘুমানো মানুষদের তুলনায় দুই
থেকে তিনগুণ বেশি। এর পেছনে মূল কারণ হলো সেরোটোনিন এবং ডোপামিনের মতো সুখী
অনুভূতি তৈরির হরমোনগুলো সার্কাডিয়ান রিদম মেনে চলে এবং রাত জাগলে এগুলোর
নিঃসরণ বিঘ্নিত হয়।
দীর্ঘমেয়াদে রাত জেগে দিনে ঘুমানোর অভ্যাস মানুষকে বিরক্তি, হতাশা, অস্থিরতা
এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার দিকে নিয়ে যায়। কারণ যখন একজন মানুষ রাতে জেগে
থাকেন তখন তার পরিবার ও বন্ধুরা ঘুমিয়ে থাকেন এবং দিনে যখন তিনি ঘুমান তখন
সবাই সক্রিয় থাকেন, ফলে একটি সামাজিক দূরত্ব তৈরি হয় যা মানসিক স্বাস্থ্যকে
আরও খারাপ করে তোলে।
দিনে ঘুমানোর কারণে হজম ও পেটের সমস্যা কীভাবে তৈরি হয়
পাকস্থলী এবং অন্ত্রের কার্যক্রমও সার্কাডিয়ান রিদম মেনে চলে এবং এই রিদম
ভেঙে গেলে হজম সিস্টেমে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। স্বাভাবিকভাবে সকালে ঘুম থেকে
ওঠার পর পাচক রস নিঃসরণ শুরু হয়, মেটাবলিজম বা বিপাকক্রিয়া সক্রিয় হয় এবং
অন্ত্রের গতিশীলতা বাড়ে যার ফলে সকালে মলত্যাগের অভ্যাস তৈরি হয়। কিন্তু
যারা রাত জেগে দিনে ঘুমান তাদের শরীর এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত
থাকে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস, বদহজম ও পেট ফাঁপার সমস্যা নিত্যসঙ্গী হয়ে
পড়ে।
রাতের বেলায় যখন খাবার খাওয়া হয় তখন শরীর সেই খাবার সঠিকভাবে হজম করতে
পারে না কারণ রাতে হজমক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই ধীর হয়ে আসে। তাই রাত জাগার
সময় যা খাওয়া হয় সেটা শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে
এবং লিভারের উপরেও অতিরিক্ত চাপ পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে রাত্রিকালীন শিফটে
কাজ করা মানুষদের মধ্যে ফ্যাটি লিভার, গ্যাস্ট্রিক আলসার এবং ইরিটেবল বাওয়েল
সিনড্রোমের হার অনেক বেশি।
এছাড়াও রাত জেগে থাকার সময় মানুষ সাধারণত অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার দিকে
বেশি ঝোঁকেন কারণ রাতে ঘ্রেলিন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায় যা ক্ষুধার অনুভূতি
তৈরি করে। এই সময়ে সাধারণত চিপস, কোল্ড ড্রিংক, ইনস্ট্যান্ট নুডলস বা
মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়া হয় যা হজম সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয় এবং
দীর্ঘমেয়াদে পাকস্থলীর মারাত্মক ক্ষতি করে।
রাত জেগে থাকলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় কেন
রাতে না ঘুমিয়ে দিনে ঘুমালে কি ক্ষতি হয় এই প্রশ্নের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
একটি উত্তর হলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমের দুর্বলতা। রাতের ঘুমে
শরীরে T-cell এবং natural killer cell এর মতো রোগ প্রতিরোধী কোষগুলোর উৎপাদন
ও কার্যকারিতা সবচেয়ে বেশি থাকে। এই কোষগুলো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া এবং
ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং শরীরকে রোগমুক্ত রাখে। যারা নিয়মিত
রাতে ঘুমান না তাদের এই প্রতিরোধী কোষগুলোর উৎপাদন কমে যায় এবং শরীর সহজেই
রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে।
আরো পড়ুনঃ মুখের ব্রণ কমানোর ঘরোয়া কার্যকরী উপায়
গবেষণায় দেখা গেছে মাত্র একটি রাত ঠিকমতো না ঘুমালেও পরের দিন শরীরের ইমিউন
সিস্টেম প্রায় ৩০ শতাংশ দুর্বল হয়ে যায় এবং এই দুর্বলতা পুষিয়ে নিতে
শরীরকে অনেক সময় লাগে। যারা মাসের পর মাস রাত জেগে দিনে ঘুমান তাদের শরীরে
ইমিউন সিস্টেম প্রায় স্থায়ীভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তারা ঘন ঘন সর্দি,
কাশি, সংক্রমণ এবং অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হন।
শুধু ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া নয়, দুর্বল ইমিউন সিস্টেম ক্যান্সারের
বিরুদ্ধেও শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। মেলাটোনিন হরমোন যা
রাতের ঘুমে তৈরি হয় সেটি নিজেই একটি শক্তিশালী অ্যান্টিক্যান্সার হরমোন।
রাতে না ঘুমালে মেলাটোনিনের ঘাটতি হয় এবং গবেষণায় দেখা গেছে রাত্রিকালীন
শিফটে দীর্ঘদিন কাজ করা মানুষদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার ও কোলন ক্যান্সারের
হার তুলনামূলক বেশি।
দিনে ঘুমানোর কারণে ওজন বৃদ্ধি হওয়ার পেছনের কারণ কী
রাতে না ঘুমিয়ে দিনে ঘুমানোর একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও দৃশ্যমান ক্ষতি হলো
অনিয়ন্ত্রিত ওজন বৃদ্ধি। অনেকে অবাক হন যে রাত জাগছেন মানে তো বেশি ক্যালোরি
পোড়ানো উচিত তাহলে ওজন বাড়বে কেন। আসলে বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। রাত জাগলে
লেপটিন হরমোনের মাত্রা কমে যায় যা পূর্ণতার অনুভূতি তৈরি করে এবং একই সাথে
ঘ্রেলিন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায় যা ক্ষুধা বাড়ায়। এই দুটি হরমোনের
ভারসাম্যহীনতার কারণে রাত জেগে থাকা মানুষেরা রাতের বেলায় অতিরিক্ত খাওয়ার
দিকে ঝুঁকে পড়েন।
ঘুমের অভাবে ইনসুলিন রেজিস্টেন্স বেড়ে যাওয়ার কারণে শরীর খাবার থেকে শক্তি
ব্যবহার করার বদলে সেটাকে চর্বি হিসেবে জমিয়ে রাখতে শুরু করে। বিশেষত পেটের
চারপাশে ভিসারাল ফ্যাট জমার হার বেড়ে যায় যা সবচেয়ে বিপজ্জনক ধরনের চর্বি
কারণ এটি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
গবেষণায় দেখা গেছে যারা রাতে ছয় ঘণ্টার কম ঘুমান তাদের মুটিয়ে যাওয়ার
সম্ভাবনা রাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানো মানুষদের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ
বেশি।
এছাড়াও রাত জাগার সময় কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়ে যা শুধু ইনসুলিন
রেজিস্টেন্সই নয় বরং সরাসরি পেটে চর্বি জমাতে সাহায্য করে। তাই যারা অনেক
চেষ্টা করেও ওজন কমাতে পারছেন না তাদের প্রথমে ঘুমের সময় ও মান ঠিক করার
দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত কারণ অনেক ক্ষেত্রে ঘুমের সমস্যা ঠিক হলেই ওজনও
নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করে।
রাত্রিকালীন শিফটে কাজ করলে কীভাবে স্বাস্থ্য রক্ষা করবেন
অনেকেই বাধ্য হয়ে রাত্রিকালীন শিফটে কাজ করেন এবং তারা প্রায়ই ভাবেন এই
পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য রক্ষা করা কি আদৌ সম্ভব। উত্তর হলো সম্পূর্ণ না হলেও
অনেকটাই ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব যদি কিছু নির্দিষ্ট অভ্যাস মেনে চলা যায়।
প্রথমত ঘুমের সময়সূচি যতটা সম্ভব নির্দিষ্ট রাখুন, মানে প্রতিদিন একই সময়ে
ঘুমানো এবং একই সময়ে ওঠার চেষ্টা করুন কারণ এতে শরীর একটি নতুন রিদমে
অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করে।
আরো পড়ুনঃ চুল পড়া বন্ধ ও চুলের গোড়া শক্ত করার উপায়
দিনে ঘুমানোর সময় ঘরকে যতটা সম্ভব অন্ধকার ও শান্ত রাখুন কারণ আলো মেলাটোনিন
নিঃসরণে বাধা দেয়। ব্ল্যাকআউট কার্টেন এবং ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করলে দিনের
ঘুমের মান অনেকটা উন্নত হয়। কাজে যাওয়ার আগে অতিরিক্ত ক্যাফেইন না খেয়ে
পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং রাতের শিফটে কাজের ফাঁকে সম্ভব হলে হালকা
স্বাস্থ্যকর খাবার খান।
রাত্রিকালীন শিফটে কাজ করলেও সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন নিয়মিত ব্যায়াম করার
চেষ্টা করুন। ব্যায়াম সার্কাডিয়ান রিদমকে পুনরায় সক্রিয় করতে এবং শরীরের
হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এছাড়াও ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট
নেওয়া এবং মাঝে মাঝে সকালের রোদে কিছুটা সময় কাটানো রাত্রিকালীন শ্রমিকদের
জন্য বিশেষভাবে উপকারী।
রাতের ঘুমের অভ্যাস ফিরিয়ে আনার কার্যকর উপায়
যারা ইতিমধ্যে রাত জেগে দিনে ঘুমানোর অভ্যাসে পড়ে গেছেন তাদের জন্য এই
অভ্যাস পরিবর্তন করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
পদক্ষেপ হলো প্রতিদিন ঘুমানোর সময় এবং ওঠার সময় ধীরে ধীরে পরিবর্তন করা।
একদিনে হঠাৎ সব বদলে ফেলার চেষ্টা না করে প্রতিদিন ১৫ থেকে ৩০ মিনিট আগে
ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করুন এবং ধীরে ধীরে রাত ১০ থেকে ১১টার মধ্যে ঘুমানোর
লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।
ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সমস্ত ইলেকট্রনিক ডিভাইস বিশেষত স্মার্টফোন,
ল্যাপটপ ও টেলিভিশন বন্ধ করুন কারণ এসব ডিভাইস থেকে নির্গত নীল আলো মেলাটোনিন
নিঃসরণে বাধা দেয় এবং ঘুম আসতে অনেক দেরি করে। এই সময়ে বই পড়া, হালকা
সংগীত শোনা বা মেডিটেশন করতে পারেন যা মনকে শান্ত করে দ্রুত ঘুম আনতে সাহায্য
করে।
ঘুমানোর আগে হালকা উষ্ণ পানিতে গোসল করলে শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা কমে যায়
এবং এই তাপমাত্রা হ্রাস শরীরকে ঘুমের মোডে নিয়ে যাওয়ার সংকেত দেয়।
ক্যামোমিল চা বা গরম দুধ ঘুমানোর আগে পান করলেও ভালো ঘুম হয়। ঘরের তাপমাত্রা
১৮ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখলে ঘুমের মান সবচেয়ে ভালো হয় কারণ
এই তাপমাত্রায় শরীর সবচেয়ে সহজে ঘুমের গভীর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
লেখকের শেষ কথা
রাতে না ঘুমিয়ে দিনে ঘুমালে কি ক্ষতি হয় এই প্রশ্নের উত্তর এখন নিশ্চয়ই
পরিষ্কার। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ওজন বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের দুর্বলতা, মানসিক
স্বাস্থ্যের অবনতি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস এবং হজম সমস্যাসহ অসংখ্য
শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মূলে রয়েছে এই একটিমাত্র অভ্যাস। রাতের ঘুম কোনো
বিলাসিতা নয় বরং এটি শরীরের একটি মৌলিক জৈবিক প্রয়োজন যা পূরণ না হলে শরীর
ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে থাকে।
যারা এখন রাত জেগে দিনে ঘুমানোর অভ্যাসে আছেন তাদের আর দেরি না করে আজ থেকেই
পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত। শুরুতে কঠিন মনে হলেও মাত্র দুই থেকে
তিন সপ্তাহ নিয়মিত চেষ্টা করলে শরীর নতুন রিদমে অভ্যস্ত হতে শুরু করে এবং
এরপর নিজেই টের পাবেন শরীর ও মন কতটা হালকা এবং সতেজ অনুভব হচ্ছে। সুস্থ
জীবনের জন্য সুস্থ ঘুম অপরিহার্য এবং রাতের ঘুম সেই সুস্থতার সবচেয়ে বড়
ভিত্তি।



টেক সমাজের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url