এই ১০টা ছোট ভুলের জন্য আপনার টাকা জমছে না
৩০ দিন মোবাইল কম ব্যবহার করলে কী পরিবর্তন হয়
এই ১০টা ছোট ভুলের জন্য আপনার টাকা জমছে না নিয়ে আজকের এই আর্টিকেলের
মাধ্যমে আপনারা জানতে পারবেন বড় বড় খরচ কমিয়ে সহজে ঢাকা জমানোর উপায়।
তাই আজকের এই আর্টিকেলে আমরা সেই ১০টি ছোট ভুল নিয়ে বিস্তারিত জানবো যেগুলোর
কারণে আপনার টাকা জমছে না। এবং যে ভুলগুলো এড়িয়ে চললে আপনি সহজে টাকা
সঞ্চয় করতে পারবেন।
পেজ সূচিপত্রঃ এই ১০টা ছোট ভুলের জন্য আপনার টাকা জমছে না
- এই ১০টা ছোট ভুলের জন্য আপনার টাকা জমছে না
- বাজেট না করে খরচ করলে কি ক্ষতি হয়
- সেভিংস শেষে রাখার অভ্যাস কি টাকা জমতে দেয় না
- ছোট ছোট অপ্রয়োজনীয় খরচ কি টাকা শেষ করে দেয়
- ক্রেডিট কার্ডের সুদ কি আপনার টাকা খাচ্ছে
- বাইরে খাওয়ার অভ্যাসে কি টাকা ব্যয় হয়
- অ্যাপের সাবস্ক্রিপশন কি চুপচাপ আপনার টাকা নিচ্ছে
- আবেগে কেনাকাটা করলে কী টাকা জমে না
- জরুরি ফান্ড না থাকলে কী বিপদে পড়তে পারেন
- আয় না বাড়ালে কি টাকা জমানো সম্ভব
- লেখকের শেষ কথা
এই ১০টা ছোট ভুলের জন্য আপনার টাকা জমছে না
যে ছোট ভুলের জন্য আপনার টাকা জমছে না, এই কথাটা পড়ে অনেকেই ভাববেন হয়তো বড়
কোনো ভুলের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই ভুলগুলো এতটাই ছোট ও স্বাভাবিক
যে আমরা প্রতিদিন এগুলো করে যাচ্ছি কিন্তু বুঝতে পারছি না। একটু ভেবে দেখুন,
প্রতিদিন একটি ছোট চায়ের দোকানে ৫০ টাকার নাস্তা, সপ্তাহে দুইদিন বাইরে খাওয়া,
মাসে একটা অপ্রয়োজনীয় পোশাক কেনা। এই ছোট ছোট খরচগুলো যোগ করলে মাসে হয়তো ৫
থেকে ১০ হাজার টাকা বের হয়ে যাচ্ছে। এটুকু প্রতি মাসে জমালে বছরে ৬০ থেকে ১ লক্ষ
২০ হাজার টাকা সঞ্চয় হতো।
আমাদের সমাজে টাকা না জমার বিষয়টা অনেক সময় ভাগ্যের সাথে জুড়ে দেওয়া হয় বা
বলা হয় বেতন কম তাই জমে না। কিন্তু দেখা গেছে অনেক কম বেতনের মানুষও দারুণ
সঞ্চয় করেন আবার অনেক বেশি বেতনের মানুষ মাস শেষে হাতে কিছুই থাকে না।
পার্থক্যটা আয়ে নয়, অভ্যাসে। সঠিক অভ্যাস ছাড়া যত বেতন বাড়বে তত বেশি খরচও
বাড়বে এবং টাকা না জমার চক্র চলতেই থাকবে।
তাই এই পোস্টে আমরা মূলত অভ্যাসের কথা বলব, যে সকল অভ্যাস এর জন্য আপনি সঞ্চয়
করতে পারেন না অথবা আপনার টাকা দ্রুত শেষ হয়ে যায়। প্রতিটি ভুল চিহ্নিত করার
মাধ্যমে, নিজের জীবনে মিলিয়ে দেখুন এবং একটার পর একটা পরিবর্তন আনতে শুরু করুন।
একসাথে সব বদলাতে হবে না, আস্তে আস্তে মাসে একটা ভুল ঠিক করলেও বছরে জীবন বদলে
যাবে।
বাজেট না করে খরচ করলে কি ক্ষতি হয়
প্রতি মাসে বেতন পেয়ে যারা কোনো বাজেট ছাড়াই খরচ শুরু করেন তারাই সবচেয়ে বড়
ভুলটা করেন। বাজেট না থাকলে কত টাকা কোথায় যাচ্ছে সেটার কোনো হিসাব থাকে না এবং
মাস শেষে দেখা যায় টাকা শেষ কিন্তু কীভাবে গেল বলা যাচ্ছে না। এই সমস্যাকে
অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় "লাইফস্টাইল ক্রিপ" অর্থাৎ খরচ অজান্তেই জীবনযাত্রার
সাথে বাড়তে থাকে কিন্তু আমরা টের পাই না। একটি সাধারণ মাসিক বাজেট তৈরি করলেই এই
সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়ে যায়।
বাজেট তৈরি করা মানে কঠিন কোনো হিসাব করা নয়। একটি সাধারণ নোটবুক বা ফোনের
নোটপ্যাডে লিখুন, এই মাসে মোট আয় কত, বাড়ি ভাড়া কত, খাবারে কত, যাতায়াতে কত
এবং বাকিটা কোথায় যাবে। এভাবে লেখার পরই দেখতে পাবেন কোথায় অপ্রয়োজনীয় খরচ
হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা ৫০-৩০-২০ নিয়ম মানার পরামর্শ দেন যেখানে ৫০ শতাংশ প্রয়োজনীয়
খরচে, ৩০ শতাংশ চাহিদায় এবং ২০ শতাংশ সঞ্চয়ে যাবে। এই জন্য আমাদের জানা
প্রয়োজন এই ১০টা ছোট ভুলের জন্য আপনার টাকা জমছে না।
বাজেট করার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো মাসের শুরুতে নির্ধারিত পরিমাণ সঞ্চয় হিসেবে
রেখে বাকিটা খরচের জন্য বরাদ্দ করা। এভাবে করলে সঞ্চয়ের টাকাটা আলাদা হয়ে যায়
এবং আপনি স্বাভাবিকভাবেই বাকি টাকার মধ্যে খরচ সীমিত রাখেন। প্রথম মাসে হয়তো
নিখুঁত হবে না কিন্তু তিন মাস ধরে বাজেট মানলে এটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়।
সেভিংস শেষে রাখার অভ্যাস কি টাকা জমতে দেয় না
বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের সঞ্চয়ের পদ্ধতি হলো প্রথমে সব খরচ করো, তারপর যদি
কিছু বাকি থাকে তাহলে সেটা জমাও। এই পদ্ধতিতে কখনোই টাকা জমে না কারণ মাস শেষে
সাধারণত কিছুই বাকি থাকে না। এটি টাকা না জমার সবচেয়ে প্রচলিত কারণগুলোর একটি
এবং সমাধানটাও খুব সহজ ক্রমটা উল্টে দিন। বেতন পাওয়ার সাথে সাথে নির্ধারিত
পরিমাণ আলাদা করে রাখুন, তারপর বাকিটা দিয়ে মাস চালান।
আরো পড়ুনঃ
১ ঘন্টা ব্যায়াম করলে কত ক্যালরি খরচ হয়
অর্থনীতিবিদরা এই পদ্ধতিকে বলেন "Pay Yourself First" অর্থাৎ নিজেকে প্রথমে
পেমেন্ট করো। এই ধারণাটা সহজ মেনে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। যখন আপনি জানেন যে মাসে
৫,০০০ টাকা সরিয়ে রেখেছেন এবং বাকি ১৫,০০০ টাকা দিয়ে মাস চালাতে হবে, তখন
স্বাভাবিকভাবেই অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়িয়ে চলেন। কিন্তু সব ২০,০০০ টাকা হাতে থাকলে
মনে হয় অনেক আছে এবং খরচ বেড়ে যায়।
সঞ্চয়কে প্রথমে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো অটোমেটিক ট্রান্সফার ব্যবস্থা
করা। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে এখন স্ট্যান্ডিং ইন্সট্রাকশন দেওয়ার সুবিধা আছে
যেখানে বেতনের দিনই নির্ধারিত পরিমাণ সঞ্চয় অ্যাকাউন্ট বা ডিপিএস অ্যাকাউন্টে
চলে যায়। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে যেমন বিকাশ বা নগদে সেভিংস ফিচার ব্যবহার করেও এই
কাজ করা যায়।
ছোট ছোট অপ্রয়োজনীয় খরচ কি টাকা শেষ করে দেয়
একটি কফি ৮০ টাকা, একটি চকোলেট ৩০ টাকা, রিকশায় যাওয়ার বদলে উবারে ১৫০ টাকা, এই
ছোট ছোট খরচগুলো মনে হয় কিছুই না। কিন্তু প্রতিদিন এমন পাঁচ থেকে ছয়টা ছোট খরচ
যোগ করলে দিনে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বের হয়ে যাচ্ছে। এই হিসেবে মাসে ৯,০০০ থেকে
১৫,০০০ টাকা শুধু এই ছোট খরচগুলোতেই চলে যাচ্ছে যা অনেকের মোট বেতনের বড় একটা
অংশ। এই ঘটনাকে বলা হয় "Latte Factor" ছোট ছোট দৈনন্দিন বিলাসিতা যা দেখতে
সামান্য কিন্তু একসাথে বিশাল আর্থিক ক্ষতির কারণ।
এই খরচগুলো বন্ধ করতে হলে প্রথমে এগুলো চিহ্নিত করতে হবে। এক সপ্তাহ ধরে প্রতিটি
খরচ নোট করুন, তারপর দেখুন কোনগুলো না হলেও চলত। হয়তো প্রতিদিন অফিসের বাইরে
থেকে চা খাওয়ার বদলে ঘরে থেকে চা নিয়ে গেলে সপ্তাহে ৩৫০ টাকা বাঁচত। বা রিকশার
বদলে সিএনজি বা বাসে গেলে যাতায়াত খরচ অর্ধেক হতো। একেকটা ছোট পরিবর্তন মিলে
মাসে বড় সঞ্চয় হয়। যদি আপনার জানা থাকে এই ১০টা ছোট ভুলের জন্য আপনার
টাকা জমছে না তাহলে অনেক সহজেই আপনি টাকা জমাতে পারবেন।
ক্রেডিট কার্ডের সুদ কি আপনার টাকা খাচ্ছে
ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন কিন্তু মাস শেষে পুরো বিল পরিশোধ করেন না এমন মানুষের
জন্য ক্রেডিট কার্ড একটি অদৃশ্য টাকা খাওয়ার মেশিন। বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডে
সুদের হার বার্ষিক ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হয় যা অনেকেই জানেন না বা গুরুত্ব
দেন না। যদি কারো ক্রেডিট কার্ডে ৫০,০০০ টাকা বকেয়া থাকে এবং শুধু ন্যূনতম
পেমেন্ট করেন তাহলে সুদ গুনতে গুনতে এই ৫০,০০০ টাকার ঋণ পরিশোধ করতে কয়েক বছর
লেগে যাবে এবং মোট পরিশোধ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এই সুদের টাকাই প্রতি মাসে সঞ্চয়ের
সুযোগ নষ্ট করে।
ব্যক্তিগত ঋণ, মহাজনের কাছ থেকে ঋণ বা এমনকি আত্মীয়ের কাছ থেকে নেওয়া ধার,
এগুলোও যদি উচ্চ সুদে হয় তাহলে প্রতি মাসে বড় অংক সুদ বাবদ চলে যায়। তাই
সঞ্চয় শুরু করার আগে উচ্চ সুদের ঋণ পরিশোধ করাটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ কারণ
ঋণের সুদ যেখানে ২০-৩০ শতাংশ সেখানে সঞ্চয়ের মুনাফা মাত্র ৬-৮ শতাংশ। তাই আগে ঋণ
মেটানো মানেই বেশি আর্থিক সুবিধা পাওয়া।
ক্রেডিট কার্ডকে কখনো "বাড়তি আয়" মনে করবেন না কারণ এটা আসলে ভবিষ্যতের আয়ের
অগ্রিম ব্যবহার। যদি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতেই হয় তাহলে মাস শেষে পুরো বিল
পরিশোধ করার নিয়ম মেনে চলুন এবং কখনো সক্ষমতার বাইরে খরচ করবেন না। ক্রেডিট
কার্ড ব্যবহারের একমাত্র সুবিধা হওয়া উচিত সুবিধা ও রিওয়ার্ড পয়েন্ট, সুদ
পরিশোধের মাধ্যম নয়।
বাইরে খাওয়ার অভ্যাসে কি টাকা ব্যয় হয়
আমাদের দেশে পরিবারগুলোতে খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ আশঙ্কাজনক। প্রয়োজনের বেশি বাজার
করে রেফ্রিজারেটরে রাখা হয় কিন্তু পচে নষ্ট হয়ে ফেলে দেওয়া হয়। এই একটা
অভ্যাসেই একটি পরিবার মাসে ১,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকা অপচয় করে। পরিকল্পনা করে বাজার
করলে এবং সাপ্তাহিক মেনু আগে থেকে ঠিক রাখলে এই অপচয় ৭০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো
সম্ভব। ছোট একটা অভ্যাস পরিবর্তনে মাসে হাজার টাকার সঞ্চয় হয়।
আরো পড়ুনঃ
৫০ হাজার টাকায় ২৫ টি ব্যবসার আইডিয়া
বাইরে খাওয়ার অভ্যাস আধুনিক শহুরে জীবনের একটা বড় খরচ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একবার
রেস্টুরেন্টে বা ফুডপান্ডায় দুইজনের খাবার অর্ডার করলে ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা চলে
যায় যেখানে বাড়িতে রান্না করলে একই মানের খাবার ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় হয়।
সপ্তাহে মাত্র তিনবার বাইরে খেলেও মাসে ৬,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা শুধু এই একটা খাতে
চলে যায়। বাইরে খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ না করলেও সপ্তাহে একবারে সীমিত করলেই বিশাল
সঞ্চয় সম্ভব।
অফিসে লাঞ্চের জন্য বাইরে যাওয়ার অভ্যাসটাও একটা বড় খরচের উৎস। প্রতিদিন বাইরে
লাঞ্চ খেতে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা লাগে কিন্তু বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে গেলে সেই খরচ
৫০ থেকে ৮০ টাকায় নেমে আসে। মাসে এই পার্থক্য ২,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকারও বেশি হতে
পারে। খাবারের ব্যাপারে একটু সচেতন হলে সংসারের বাজেটে বিশাল পরিবর্তন আসে।
অ্যাপের সাবস্ক্রিপশন কি চুপচাপ আপনার টাকা নিচ্ছে
Netflix, YouTube Premium, Spotify, বিভিন্ন অ্যাপের প্রিমিয়াম ফিচার। এই
সাবস্ক্রিপশনগুলো প্রতি মাসে ক্রেডিট কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিং থেকে চুপচাপ টাকা
কেটে নেয়। একটা একটা করে নেওয়া সাবস্ক্রিপশন মিলিয়ে মাসে ৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা
অজান্তেই চলে যাচ্ছে অনেকের। এর মধ্যে অর্ধেক হয়তো এখন আর নিয়মিত ব্যবহারও হয়
না কিন্তু বন্ধ করা হয়নি। এই "ভুলে যাওয়া সাবস্ক্রিপশন" একটি অদৃশ্য টাকার
ড্রেন।
এই সমস্যার সমাধান করতে হলে এক মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা মোবাইল ব্যাংকিং
হিস্টোরি ভালো করে দেখুন। অটোমেটিক কাটছে এমন প্রতিটা পেমেন্ট চিহ্নিত করুন এবং
সেগুলোর মধ্যে কোনগুলো আসলে নিয়মিত ব্যবহার হচ্ছে না সেগুলো বন্ধ করে দিন। একই
বিনোদনের জন্য পরিবারের সবাই মিলে একটি পেইড অ্যাকাউন্ট শেয়ার করলে খরচ অনেক
কমে।
অটো-রিনিউয়াল বন্ধ রাখাটাও একটা কার্যকর অভ্যাস। যখন কোনো সাবস্ক্রিপশন নেবেন
তখন অটো-রিনিউ অপশন বন্ধ রাখুন। এতে মেয়াদ শেষে নিজেকে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে
হবে যে এটা আসলে আরও নেওয়া দরকার কিনা। এই ছোট্ট পদক্ষেপ অজান্তে টাকা বের হয়ে
যাওয়া থেকে আপনাকে রক্ষা করবে। এই ১০টা ছোট ভুলের জন্য আপনার টাকা জমছে না
বিষের মধ্যে সাবস্ক্রিপশনের বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আবেগে কেনাকাটা করলে কী টাকা জমে না
"সেল চলছে, ৫০% ছাড়" এই কথাটা দেখলেই অনেকের হাত নিজে থেকেই মানিব্যাগ বা ফোনের
দিকে যায়। অথচ ছাড়ের পণ্যটা আসলে দরকার আছে কিনা সেটা ভাবার সময় হয় না।
আবেগের বশে বা "মিস করব না" এই মনোভাব থেকে করা কেনাকাটা প্রতি মাসে হাজার হাজার
টাকা নষ্ট করে। বাংলাদেশে ইদানীং অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্মগুলো এই আবেগকে আরও উসকে
দিচ্ছে। ফ্ল্যাশ সেল, কাউন্টডাউন টাইমার, "মাত্র ৩টি বাকি" এইসব কৌশল আমাদের
অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় প্রলুব্ধ করে।
আবেগের কেনাকাটা থেকে বাঁচতে "উইশলিস্ট পদ্ধতি" অনেক কার্যকর। যখনই কোনো কিছু
কিনতে মন চায় সেটা উইশলিস্টে যোগ করুন কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কিনবেন না। ৭ থেকে ১৫
দিন পরে আবার দেখুন সেটা এখনো দরকার মনে হচ্ছে কিনা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যাবে
সেই ইচ্ছাটা কমে গেছে এবং সেটা না কিনলেও জীবন ঠিকঠাক চলছে। এই পদ্ধতিতে মাসে
কয়েক হাজার টাকার অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা এড়ানো যায়।
কেনাকাটার আগে একটা সহজ প্রশ্ন নিজেকে করুন, এটা না থাকলে কি আমার জীবনে কোনো
সমস্যা হবে? যদি উত্তর না হয় তাহলে সেটা প্রয়োজন নয়, শুধু চাহিদা। প্রয়োজন আর
চাহিদার মধ্যে পার্থক্য করতে পারলেই আবেগের কেনাকাটা অনেকটা কমে যায়। মনে
রাখবেন, সেল মানে বাঁচানো নয়, সেল মানে খরচ করার আরেকটা কারণ।
জরুরি ফান্ড না থাকলে কী বিপদে পড়তে পারেন
অনেকেই কষ্ট করে কিছু টাকা জমান কিন্তু হঠাৎ বিপদে পড়লে অসুস্থতা, চাকরি হারানো
বা কোনো জরুরি মেরামত সেই জমানো টাকা ভেঙে ফেলতে হয়। এভাবে সঞ্চয় আর বাড়তে
পারে না। এই সমস্যার সমাধান হলো জরুরি ফান্ড বা ইমার্জেন্সি ফান্ড তৈরি করা যেটা
সঞ্চয়ের আলাদা একটা স্তর হিসেবে কাজ করে। বিশেষজ্ঞরা বলেন মাসিক খরচের তিন থেকে
ছয় মাসের সমান টাকা জরুরি ফান্ডে রাখা উচিত যাতে যেকোনো বিপদে দীর্ঘমেয়াদি
সঞ্চয় ভাঙতে না হয়।
আরো পড়ুনঃ
ফোনে ভাইরাস ঢুকেছে কিনা বোঝার উপায়
জরুরি ফান্ড না থাকলে বিপদে মহাজন বা ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হয় যা আরও
বড় আর্থিক সংকট তৈরি করে। এই ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে আবার সঞ্চয় করার সুযোগ চলে
যায় এবং মানুষ এক ধরনের আর্থিক চক্রে আটকে পড়েন। তাই জরুরি ফান্ড গড়ে তোলাটা
শুধু সঞ্চয়ের অভ্যাস নয়, এটা আর্থিক নিরাপত্তার প্রথম স্তর। এই জন্য আমাদের
জানা প্রয়োজন এই ১০টা ছোট ভুলের জন্য আপনার টাকা জমছে না।
জরুরি ফান্ড শুরু করতে হলে আলাদা একটি সেভিংস অ্যাকাউন্ট খুলুন যেখানে সহজে টাকা
তোলা যাবে কিন্তু নিয়মিত খরচের অ্যাকাউন্ট থেকে আলাদা। প্রতি মাসে এখানে ছোট
পরিমাণ হলেও রাখুন এবং শুধু সত্যিকারের জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এই টাকা স্পর্শ
করবেন না। কয়েক মাসেই একটি কার্যকর জরুরি ফান্ড তৈরি হয়ে যাবে।
আয় না বাড়ালে কি টাকা জমানো সম্ভব
খরচ কমানো সঞ্চয়ের একটি দিক কিন্তু সমীকরণের অন্য দিকটা হলো আয় বাড়ানো। অনেকে
শুধু খরচ কমাতে কমাতে এমন অবস্থায় পৌঁছান যে জীবনযাত্রার মান অসহনীয় হয়ে যায়
কিন্তু তবুও সঞ্চয় যথেষ্ট হয় না কারণ মূল আয়টাই কম। যদি বর্তমান আয়ের ২০
শতাংশ সঞ্চয় যথেষ্ট না হয় তাহলে শুধু খরচ কমানো সমাধান নয়, আয় বাড়ানোর দিকেও
মনোযোগ দেওয়া জরুরি। ফ্রিল্যান্সিং, টিউশন, অনলাইন বিক্রি বা যেকোনো পার্ট-টাইম
কাজ বাড়তি আয়ের পথ খুলে দিতে পারে।
বর্তমান চাকরিতে বেতন বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে কথা না বলাটাও একটা ভুল যা অনেকে করেন।
অনেকে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও বেতন বৃদ্ধির দাবি করতে সংকোচ বোধ করেন। কিন্তু
সঠিকভাবে নিজের কর্মদক্ষতা উপস্থাপন করে বেতন বৃদ্ধির আলোচনা করলে অনেক ক্ষেত্রে
ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়। এটা না করাটা কোনো বিনিয়োগ না করেই একটা বড় আর্থিক
সুযোগ হাতছাড়া করার মতো।
দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করাটা দীর্ঘমেয়াদে আয় বাড়ানোর সেরা পথ। নতুন কোনো
দক্ষতা শিখলে, অনলাইন কোর্স করলে বা পেশাদার সার্টিফিকেট অর্জন করলে বাড়তি আয়ের
সুযোগ তৈরি হয়। অনেকে মনে করেন কোর্সের পেছনে টাকা খরচ করা সঞ্চয়ের বিরুদ্ধে,
কিন্তু আসলে এটাই সবচেয়ে ভালো বিনিয়োগ কারণ একটি ভালো কোর্স জীবনভর বেশি আয়ের
সুযোগ দিতে পারে।
লেখকের শেষ কথা
এই ১০টা ছোট ভুলের জন্য আপনার টাকা জমছে না, এই সত্যটা বোঝার পরে এখন জানা দরকার
এই ভুলগুলো কীভাবে কাটিয়ে উঠবেন। বাজেট না করা, সঞ্চয়কে শেষে রাখা, ছোট
অপ্রয়োজনীয় খরচে উদাসীন থাকা, উচ্চ সুদের ঋণ বহন করা, খাবার অপচয়, ভুলে যাওয়া
সাবস্ক্রিপশন, আবেগের কেনাকাটা, জরুরি ফান্ড না রাখা এবং আয় বাড়ানোর চেষ্টা না
করা। এই প্রতিটি ভুলই আলাদাভাবে ছোট কিন্তু একসাথে মিলিয়ে দেখলে এগুলো আপনার
পুরো সঞ্চয়কে অসম্ভব করে তুলছে। একসাথে সব বদলানোর চেষ্টা না করে এই মাসে একটি
ভুল বেছে নিন এবং শুধু সেটাই ঠিক করুন।
আমার মতে টাকা জমানো মানে কঠিন জীবন যাপন করা নয়, এটা মানে সচেতনভাবে বাঁচা। যে
টাকা অজান্তে বের হয়ে যাচ্ছে সেটাকে সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করাটাই সঞ্চয়ের প্রথম
ধাপ। আর্থিক স্বাধীনতা হঠাৎ আসে না, এটা আসে প্রতিদিনের ছোট ছোট সঠিক সিদ্ধান্তের
মধ্য দিয়ে। আজ থেকেই শুরু করুন প্রথম মাসে হয়তো ৫০০ টাকা বাঁচাতে পারবেন, পরের
মাসে ১,০০০ এবং ধীরে ধীরে টাকা জমানোটাই আপনার স্বাভাবিক জীবনের অংশ হয়ে যাবে।



টেক সমাজের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url